২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের জীবন অনেকটা প্রযুক্তি নির্ভর। দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার টাইপিং, স্মার্টফোনের ব্যবহার এবং ভুল ভঙ্গিতে কব্জি ব্যবহারের ফলে ‘কব্জিতে ব্যথা’ এখন একটি নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে এই ব্যথা সাধারণ পেশির টান হলেও, কখনো কখনো এটি কার্পাল টানেল সিনড্রোম বা বাতের লক্ষণ হতে পারে। আজকের আর্টিকেলে আমরা জানব হাতের কব্জিতে ব্যথা হলে করণীয় এবং এর আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।
হাতের কব্জিতে ব্যথা কেন হয়?
কব্জিতে ব্যথার পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে:
-
কার্পাল টানেল সিনড্রোম: কব্জির ভেতরের স্নায়ুতে চাপ পড়লে।
-
টেনডোনাইটিস: কব্জির টেন্ডন বা পেশিতন্তুর প্রদাহ।
-
রিপিটেটিভ স্ট্রেইন ইনজুরি (RSI): একই কাজ বারবার করার ফলে (যেমন: মাউস চালানো)।
-
আঘাত বা মচকানো: হঠাৎ পড়ে গিয়ে বা ভারী কিছু তুলে কব্জিতে চোট পাওয়া।
হাতের কব্জিতে ব্যথা হলে করণীয়
ব্যথা শুরু হওয়ার সাথে সাথে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিলে বড় ধরণের জটিলতা এড়ানো সম্ভব:
১. বিশ্রাম (Rest): কব্জির নড়াচড়া কমিয়ে দিন। অন্তত ৪৮ ঘণ্টা কব্জিকে বিশ্রাম দেওয়া উচিত। ২. বরফ সেঁক (Ice Therapy): ফোলা কমাতে ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণে দিনে ৩-৪ বার ১৫ মিনিট করে বরফ সেঁক দিন। ৩. ব্রেস বা ব্যান্ডেজ ব্যবহার: কব্জিকে স্থির রাখতে রিস্ট সাপোর্ট বা ইলাস্টিক ব্যান্ডেজ ব্যবহার করুন। ৪. সঠিক অঙ্গভঙ্গি (Ergonomics): কিবোর্ড বা মাউস ব্যবহারের সময় কব্জি যেন সোজা থাকে সেদিকে খেয়াল রাখুন। কব্জির নিচে নরম প্যাড ব্যবহার করতে পারেন। ৫. ভারী কাজ বর্জন: ব্যথা থাকা অবস্থায় ভারী বালতি তোলা বা ব্যায়াম করা থেকে বিরত থাকুন।
হাতের কব্জির ব্যথার ব্যায়াম
পেশি নমনীয় রাখতে এবং রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে হাতের কব্জির ব্যথার ব্যায়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে সহজ ৩টি ব্যায়াম দেওয়া হলো:
-
রিস্ট এক্সটেনশন ও ফ্লেক্সন: হাত সোজা করে সামনের দিকে ধরুন। হাতের তালু নিচের দিকে রেখে অন্য হাত দিয়ে ধীরে ধীরে নিজের দিকে টানুন। ১০ সেকেন্ড ধরে রেখে ছেড়ে দিন। একইভাবে তালু ওপরের দিকে রেখে করুন।
-
থাম্ব স্ট্রেচ (Thumb Stretch): বুড়ো আঙুলকে হাতের তালুর কাছে নিয়ে আসুন এবং অন্য আঙুল দিয়ে আলতো করে চাপ দিন।
-
কব্জি ঘোরানো (Wrist Circles): দুই হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধীরে ধীরে ঘড়ির কাটার দিকে এবং বিপরীত দিকে ৫ বার করে ঘোরান।
[Image: Illustration of wrist stretching exercises for relief]
হাতের কব্জি ব্যথার ঔষধ
ব্যথা অসহ্য হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট কিছু ঔষধ গ্রহণ করা যেতে পারে। হাতের কব্জি ব্যথার ঔষধ সাধারণত কয়েক ধরণের হয়:
১. ব্যথানাশক জেল (Topical Gel): ডাইক্লোফেনাক বা কিটোপ্রোফেন যুক্ত জেল কব্জিতে মালিশ করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। (যেমন: Voveran Gel)। ২. পেইনকিলার ট্যাবলেট (NSAIDs): মাঝারি ব্যথার জন্য নেপ্রোক্সেন (Naproxen) বা প্যারাসিটামল সেবন করা যেতে পারে। তবে তীব্র ব্যথায় চিকিৎসকরা এটোরিকক্সিব (Etoricoxib) প্রেসক্রাইব করেন। ৩. বি-ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট: যদি নার্ভের সমস্যার কারণে ব্যথা হয়, তবে ভিটামিন বি১, বি৬ এবং বি১২ সমৃদ্ধ ট্যাবলেট (যেমন: Neobion) কার্যকরী। ৪. স্নায়ুর ঔষধ: কার্পাল টানেল সিনড্রোমের ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা প্রিগাবালিন (Pregabalin) জাতীয় ঔষধ দিয়ে থাকেন।
২০২৬ সালে আধুনিক চিকিৎসা: পিআরপি থেরাপি
যদি ঔষধ এবং ব্যায়ামে কাজ না হয়, তবে ২০২৬ সালে পিআরপি (PRP) ইনজেকশন বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এটি শরীরের নিজস্ব রক্ত থেকে প্লাজমা নিয়ে আক্রান্ত স্থানে দেওয়া হয়, যা প্রাকৃতিকভাবে টিস্যু মেরামত করে।
কখন দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
-
যদি কব্জি ফুলে যায় এবং লাল হয়ে যায়।
-
আঙুল অবশ হয়ে গেলে বা শক্তি না পেলে।
-
ব্যথা যদি হাতের কনুই পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়।
উপসংহার
হাতের কব্জির ব্যথা অবহেলা করলে এটি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্বের কারণ হতে পারে। তাই হাতের কব্জিতে ব্যথা হলে করণীয় পদক্ষেপগুলো মেনে চলুন এবং প্রয়োজনে দ্রুত একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।


