শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। অনেক সময় দেখা যায় বাচ্চার জ্বর কমছে না বা সে খুব বিরক্ত করছে, কিন্তু সঠিক কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের অন্যতম কারণ হতে পারে ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)।
আজকের আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব বাচ্চাদের প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ এবং কখন আপনার দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
বয়সভেদে বাচ্চাদের প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণ
শিশুদের ক্ষেত্রে ইনফেকশনের লক্ষণগুলো বয়সের সাথে ভিন্ন হতে পারে। নিচে বয়সভিত্তিক লক্ষণগুলো তুলে ধরা হলো:
ক. নবজাতক ও খুব ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে (০-২ বছর):
ছোট শিশুরা কথা বলতে পারে না, তাই তাদের লক্ষণগুলো ভিন্ন হয়:
-
অকারণ জ্বর: কোনো ঠান্ডা বা কাশি ছাড়াই হঠাৎ করে জ্বর আসা।
-
খাবারে অনিহা: বাচ্চা দুধ পান করতে চায় না বা বমি করে দেয়।
-
অতিরিক্ত কান্নাকাটি: বাচ্চা সবসময় খিটখিটে মেজাজে থাকে।
-
ওজন না বাড়া: ঠিকমতো খাওয়ার পরেও বাচ্চার সঠিক ওজন বৃদ্ধি না পাওয়া।
-
প্রস্রাবে দুর্গন্ধ: ডায়াপার পরিবর্তনের সময় বা বাচ্চার প্রস্রাবে অস্বাভাবিক কড়া গন্ধ পাওয়া।
খ. একটু বড় শিশুদের ক্ষেত্রে (৩-১০ বছর):
বড় শিশুরা সাধারণত তাদের অস্বস্তির কথা বলতে পারে। তাদের প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
-
প্রস্রাবের সময় জ্বালা-পোড়া: বাচ্চার প্রস্রাব করার সময় ব্যথা বা অস্বস্তি অনুভব করা।
-
ঘন ঘন প্রস্রাব: অল্প সময়ের ব্যবধানে বারবার প্রস্রাব করতে যাওয়া।
-
তীব্র বেগ: প্রস্রাব আটকে রাখতে না পারা (Urgency)।
-
পেটে বা কোমরে ব্যথা: তলপেটে বা পিঠের নিচের দিকে ব্যথা হওয়া।
-
বিছানায় প্রস্রাব: যে শিশুটি আগে শুকনো থাকত, সে হঠাৎ করে আবার বিছানায় প্রস্রাব করা শুরু করলে এটি ইনফেকশনের লক্ষণ হতে পারে।
শিশুদের প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া ও অন্যান্য উপসর্গ (একনজরে)
| লক্ষণ | বর্ণনা |
| জ্বর | হালকা থেকে তীব্র জ্বর (সাধারণত ১০১°F এর বেশি)। |
| প্রস্রাবের রং | ঘোলাটে বা লালচে প্রস্রাব আসা। |
| ক্লান্তি | বাচ্চা সবসময় ঝিমিয়ে থাকে এবং খেলাধুলায় উৎসাহ পায় না। |
| প্রস্রাব করার সময় কান্না | প্রস্রাব বের হওয়ার সময় বাচ্চার তীব্র ব্যথায় চিৎকার করা। |
বাচ্চাদের প্রস্রাবে ইনফেকশন কেন হয়?
শিশুদের মধ্যে ইউটিআই হওয়ার প্রধান কয়েকটি কারণ হলো:
-
কোষ্ঠকাঠিন্য: যদি বাচ্চার পায়খানা কড়া হয়, তবে প্রস্রাবের রাস্তায় ব্যাকটেরিয়া জমা হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
-
অপরিচ্ছন্নতা: ডায়াপার দীর্ঘক্ষণ পরিয়ে রাখা বা সঠিক নিয়মে পরিচ্ছন্ন না রাখা।
-
প্রস্রাব চেপে রাখা: খেলার ছলে অনেক শিশু দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখে।
-
শারীরিক গঠন: মেয়ে শিশুদের মূত্রনালী ছোট হওয়ার কারণে তাদের ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি ছেলেদের তুলনায় বেশি।
কখন দ্রুত ডাক্তার দেখাবেন? (রেড ফ্ল্যাগস)
নিচের লক্ষণগুলো দেখলে দেরি না করে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ বা পেডিয়াট্রিক নেফ্রোলজিস্টের পরামর্শ নিন:
-
যদি বাচ্চার প্রস্রাবের সাথে রক্ত দেখা যায়।
-
যদি বাচ্চার জ্বরের সাথে পিঠে বা কোমরে প্রচণ্ড ব্যথা থাকে।
-
যদি বাচ্চা বারবার বমি করে এবং নেতিয়ে পড়ে।
-
যদি বাচ্চার প্রস্রাব একদম কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়।
বাচ্চাদের ইউটিআই প্রতিকার ও ঘরোয়া প্রতিরোধ
-
প্রচুর পানি: বাচ্চাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি ও তরল খাবার দিন।
-
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: ডায়াপার ভিজে গেলে দ্রুত পরিবর্তন করুন। পটি ট্রেনিং দেওয়ার সময় সঠিক হাইজিন মেনে চলুন।
-
সুতি অন্তর্বাস: বাচ্চাদের সবসময় আরামদায়ক সুতি অন্তর্বাস পরানোর চেষ্টা করুন।
-
ফাইবার সমৃদ্ধ খাবার: কোষ্ঠকাঠিন্য এড়াতে বাচ্চাকে শাকসবজি ও ফলমূল বেশি করে খাওয়ান।
উপসংহার
বাচ্চাদের প্রস্রাবে ইনফেকশনের লক্ষণগুলো অবহেলা করা মানে বড় ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনা। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে সঠিক সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শুরু করা প্রয়োজন। সচেতন মা-বাবা হিসেবে বাচ্চার আচরণ ও প্রস্রাবের ধরণের দিকে লক্ষ্য রাখুন।
বিদ্র: এই কন্টেন্টটি সাধারণ তথ্যের জন্য লেখা। বাচ্চার কোনো অসুস্থতায় অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


