মূত্রথলি বা ইউরিনারি ব্লাডার আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ যা প্রস্রাব জমা রাখে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মধ্যে যে ক্যান্সারগুলো বেশি দেখা যায়, তার মধ্যে মূত্রথলির ক্যান্সার অন্যতম। এই ক্যান্সারের লক্ষণগুলো অনেক সময় সাধারণ প্রস্রাবের ইনফেকশন বা ইউটিআই (UTI) এর মতো মনে হতে পারে, যা রোগ নির্ণয়ে দেরি করে দেয়।
আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব মূত্রথলির ক্যান্সারের লক্ষণ এবং এর থেকে প্রতিকারের উপায়।
প্রধান লক্ষণ: প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসা (Hematuria)
মূত্রথলির ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রথম লক্ষণ হলো প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া।
-
দৃশ্যমান রক্ত: অনেক সময় প্রস্রাব লাল বা গোলাপি রঙের হতে পারে।
-
অদৃশ্য রক্ত: কখনও কখনও রক্ত চোখে দেখা যায় না, যা ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ধরা পড়ে।
-
ব্যথামুক্ত রক্তপাত: অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রক্তপাতের সময় কোনো ব্যথা থাকে না, যা একে সংক্রমণের থেকে আলাদা করে। এটি কিছুদিন পর একা একাই বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তবে তা ক্যান্সারের ঝুঁকি শেষ করে না।
প্রস্রাবের অভ্যাসে পরিবর্তন
টিউমার যদি মূত্রথলির দেওয়ালে চাপ সৃষ্টি করে, তবে প্রস্রাব করার অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়:
-
ঘন ঘন প্রস্রাব: আগের চেয়ে অনেক বেশিবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া।
-
তীব্র ইচ্ছা: প্রস্রাব ধরলে তা আটকে রাখতে না পারা (Urgency)।
-
প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া: প্রস্রাব করার সময় হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি হওয়া।
-
প্রস্রাবের প্রবাহে বাধা: প্রস্রাব শুরু করতে সমস্যা হওয়া বা এর গতি কমে যাওয়া।
অগ্রসর পর্যায়ের লক্ষণসমূহ (Advanced Symptoms)
যদি ক্যান্সার মূত্রথলি ছাড়িয়ে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে আরও কিছু তীব্র লক্ষণ দেখা দিতে পারে:
-
তলপেটে বা কোমরে ব্যথা: বিশেষ করে পিঠের একপাশে তীব্র ব্যথা হওয়া।
-
ওজন কমে যাওয়া: কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত ওজন কমে যাওয়া।
-
পা ফুলে যাওয়া: লিম্ফ নোডে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়লে পায়ের পাতা বা পা ফুলে যেতে পারে।
-
হাড়ের ব্যথা: যদি ক্যান্সার হাড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
ইউটিআই (UTI) বনাম মূত্রথলির ক্যান্সার: পার্থক্য চিনুন
অনেক সময় সাধারণ ইনফেকশনের সাথে মানুষ একে গুলিয়ে ফেলে। নিচের টেবিলটি আপনাকে পার্থক্য বুঝতে সাহায্য করবে:
| বিষয় | প্রস্রাবে ইনফেকশন (UTI) | মূত্রথলির ক্যান্সার |
| রক্তপাত | প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া ও রক্ত। | সাধারণত ব্যথামুক্ত রক্তপাত। |
| জ্বর | জ্বর এবং শরীর কাঁপানো থাকে। | প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর থাকে না। |
| ঔষধের প্রভাব | অ্যান্টিবায়োটিক খেলে সেরে যায়। | অ্যান্টিবায়োটিকে রক্তপাত বন্ধ হয় না। |
| স্থায়িত্ব | কয়েকদিন থাকে। | বারবার ফিরে আসে। |
মূত্রথলির ক্যান্সারের ঝুঁকি কাদের বেশি?
২০২৬ সালের আধুনিক গবেষণা অনুযায়ী নিচের ব্যক্তিদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি:
-
ধূমপায়ী: ধূমপান মূত্রথলির ক্যান্সারের এক নম্বর কারণ। তামাকের রাসায়নিক প্রস্রাবের মাধ্যমে মূত্রথলিতে জমা হয়ে কোষের ক্ষতি করে।
-
রাসায়নিকের সংস্পর্শ: যারা রঞ্জক (Dye), রাবার বা চামড়া শিল্পে কাজ করেন।
-
দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ: যাদের বারবার প্রস্রাবে ইনফেকশন বা কিডনিতে পাথর হয়।
-
বয়স: সাধারণত ৫৫ বছরের ঊর্ধ্বের ব্যক্তিদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি।
রোগ নির্ণয় ও করণীয় কি?
যদি আপনার প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসে, তবে দেরি না করে একজন ইউরোলজিস্ট (Urologist) দেখান। ডাক্তাররা সাধারণত নিচের পরীক্ষাগুলো করেন:
-
Urine Cytology: প্রস্রাবের কোষে ক্যান্সার আছে কি না দেখা।
-
Cystoscopy: একটি ছোট ক্যামেরা প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে মূত্রথলিতে ঢুকিয়ে সরাসরি পরীক্ষা করা।
-
Biopsy: টিউমারের অংশ বিশেষ কেটে পরীক্ষা করা।
উপসংহার
মূত্রথলির ক্যান্সারের লক্ষণ আগে থেকে জানা থাকলে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব। মনে রাখবেন, প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসা কখনোই স্বাভাবিক নয়। এটি সাধারণ ইনফেকশন হোক বা ক্যান্সার—দ্রুত রোগ নির্ণয়ই সুস্থ থাকার একমাত্র পথ।
সতর্কবার্তা: এই নিবন্ধটি সাধারণ তথ্যের জন্য। আপনার কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।


