মুখের একপাশ হঠাৎ করে অবশ হয়ে যাওয়া বা ঝুলে যাওয়া একটি অত্যন্ত আতঙ্কিত করার মতো বিষয়। অনেকেই একে ‘স্ট্রোক’ মনে করে ভুল করেন, কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি বেলস পালসি (Bell’s Palsy) নামক একটি স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে।
নিচে বেলস পালসি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
বেলস পালসি কী? (What is Bell’s Palsy?)
বেলস পালসি হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে আমাদের মুখের পেশি নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু বা নার্ভ (যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ৭ম ক্র্যানিয়াল নার্ভ বলা হয়) হঠাৎ ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রদাহের (Inflammation) শিকার হয়। এর ফলে মুখের একপাশের পেশিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে বা সম্পূর্ণ অবশ হয়ে যায়। সাধারণত এটি শরীরের একপাশেই দেখা দেয় এবং সাময়িক হয়ে থাকে।
বেলস পালসি কেন হয়? (Causes)
বেলস পালসি হওয়ার সঠিক কারণ চিকিৎসকরা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নন, তবে প্রধান কিছু কারণ নিচে দেওয়া হলো:
-
ভাইরাস সংক্রমণ: এটি বেলস পালসির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে ধরা হয়। বিশেষ করে হার্পিস সিমপ্লেক্স (Herpes Simplex), যা ঠোঁটের চারপাশে ঘা বা কোল্ড সোর তৈরি করে, সেই ভাইরাসটিই ফেসিয়াল নার্ভকে আক্রমণ করতে পারে।
-
স্নায়ুর প্রদাহ ও ফোলাভাব: মুখের পেশি যে সূক্ষ্ম হাড়ের ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসে, কোনো কারণে সেই নার্ভটি ফুলে গেলে বা সেখানে প্রদাহ হলে রক্ত সঞ্চালন বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে মুখ অবশ হয়ে যায়।
-
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা: শরীরের ইমিউন সিস্টেম হঠাৎ করে নিজের কোষের বিরুদ্ধে কাজ শুরু করলে (অটো-ইমিউন রেসপন্স) এমন হতে পারে।
-
অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও ক্লান্তি: অতিরিক্ত স্ট্রেস শরীরকে দুর্বল করে দেয়, যা ভাইরাসের আক্রমণ সহজ করে তোলে।
লক্ষণসমূহ (Symptoms)
বেলস পালসি হঠাৎ করেই শুরু হয়। সাধারণত ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লক্ষণগুলো তীব্র হয়ে ওঠে:
-
মুখের একপাশ ঝুলে যাওয়া বা হাসতে কষ্ট হওয়া।
-
একপাশের চোখ পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারা।
-
কথা বলতে বা খাবার চিবোতে অসুবিধা হওয়া।
-
মুখের স্বাদ কমে যাওয়া।
-
কানের পেছনে বা নিচে ব্যথা অনুভূত হওয়া।
-
চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়া বা চোখ শুকিয়ে যাওয়া।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
বেলস পালসি শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত (সাধারণত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে) চিকিৎসা শুরু করলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
-
ওষুধ: ডাক্তাররা সাধারণত ফোলা কমানোর জন্য স্টেরয়েড এবং ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ দিয়ে থাকেন।
-
চোখের যত্ন: যেহেতু রোগী চোখ বন্ধ করতে পারেন না, তাই ড্রপ ব্যবহার করা এবং ঘুমানোর সময় চোখের প্যাচ ব্যবহার করা জরুরি যাতে চোখ শুকিয়ে না যায়।
-
ফিজিওথেরাপি: মুখের পেশির বিশেষ ব্যায়াম বা ফিজিওথেরাপি দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
-
বিশ্রাম: পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং পুষ্টিকর খাবার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
সতর্কবার্তা ,যদি আপনার বা পরিচিত কারও মুখের একপাশ অবশ হয়ে যায়, তবে দেরি না করে নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, এটি কোনো জাদুটোনা বা স্ট্রোক নয়, বরং একটি চিকিৎসাযোগ্য স্নায়বিক সমস্যা। বেশিরভাগ মানুষ ২ সপ্তাহ থেকে ৬ মাসের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন।


