ডায়রিয়া কী?
ডায়রিয়া হলো এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে দিনে তিন বা তার বেশিবার পাতলা পায়খানা হয়। এটি সাধারণত দূষিত খাবার বা পানির মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা পরজীবীর সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। সময়মতো সঠিক ব্যবস্থা না নিলে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও লবণ বেরিয়ে গিয়ে মারাত্মক পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে।
ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ
শুরুতেই ডায়রিয়া রোগের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারলে জটিলতা এড়ানো সম্ভব। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
-
পাতলা পায়খানা: বারবার তরল বা পানির মতো পায়খানা হওয়া।
-
পেটে কামড়ানো: পায়খানার আগে বা পরে পেটে তীব্র ব্যথা বা মোচড় দেওয়া।
-
বমি ভাব: খাবারের অরুচি এবং বারবার বমি হওয়া।
-
পানিশূন্যতা: মুখ ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া এবং চোখ বসে যাওয়া।
-
দুর্বলতা: শরীর প্রচণ্ড নিস্তেজ হয়ে পড়া এবং মাথা ঘোরা।
ডায়রিয়া রোগের কারণ

কি কি কারণে সাধারণত মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়, তা জানা জরুরি। নিচে ডায়রিয়া রোগের কারণসমূহ একটি টেবিলের মাধ্যমে দেওয়া হলো:
| কারণের ধরন | প্রধান কারণসমূহ |
| সংক্রমণ | রোটাভাইরাস (বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে) এবং ই-কোলাই বা কলেরার মতো ব্যাকটেরিয়া। |
| দূষিত পানি ও খাবার | অপরিষ্কার পানি পান করা এবং পচা বা বাসি খাবার গ্রহণ। |
| অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ | খোলা স্থানে মলত্যাগ এবং খাবার খাওয়ার আগে হাত না ধোয়া। |
| ওষুধের প্রভাব | নির্দিষ্ট কিছু অ্যান্টিবায়োটিক বা ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত ঔষধ সেবন। |
ডায়রিয়া হলে করণীয় কি?
হঠাৎ ডায়রিয়া হলে করণীয় কি সে সম্পর্কে আমাদের সবার পরিষ্কার ধারণা থাকা উচিত। নিচে জরুরি পদক্ষেপগুলো দেওয়া হলো:
-
ওরস্যালাইন (ORS): প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর পরিমাণমতো ওরস্যালাইন পান করতে হবে। এটি শরীরে লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে।
-
তরল খাবার: ডাবের পানি, ভাতের মাড়, চিঁড়ার পানি বা সাধারণ বিশুদ্ধ পানি পান করুন।
-
পরিচ্ছন্নতা: খাওয়ার আগে এবং টয়লেট ব্যবহারের পর সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন।
-
হাসপাতালে যোগাযোগ: যদি রোগীর অবস্থা খুব বেশি খারাপ হয় বা পায়খানার সাথে রক্ত যায়, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। ঢাকা ও আশেপাশে বসবাসকারীদের জন্য মহাখালী ডায়রিয়া হাসপাতাল (icddr,b) উন্নত চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য স্থান।
বাচ্চাদের ডায়রিয়া হলে করণীয়
শিশুদের ক্ষেত্রে ডায়রিয়া খুব দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। বাচ্চাদের ডায়রিয়া হলে করণীয় হলো:
১. শিশুকে ঘন ঘন বুকের দুধ বা সাধারণ খাবার দিন। খাবার কোনোভাবেই বন্ধ করা যাবে না।
২. প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ১০-২০ চা চামচ ওরস্যালাইন দিন।
৩. চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জিংক (Zinc) সিরাপ বা ট্যাবলেট খাওয়াতে হবে, যা ডায়রিয়ার মেয়াদ কমায়।
৪. যদি শিশু একেবারেই খেতে না পারে বা নিস্তেজ হয়ে পড়ে, তবে দ্রুত হাসপাতালে নিন।
ডায়রিয়া হলে কি খাওয়া উচিত ও কি ফল খাওয়া যাবে?
সঠিক খাবার দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে। অনেকেই দ্বিধায় থাকেন যে ডায়রিয়া হলে কি খাওয়া উচিত। নিচে একটি তালিকা দেওয়া হলো:
নিরাপদ খাবার ও পানীয়:
-
নরম জাউ ভাত, কাঁচা পেঁপে দিয়ে রান্না করা মাছের ঝোল।
-
ডাবের পানি এবং চিঁড়া ভেজানো পানি।
-
টোকমা বা ইসবগুলের শরবত।
ডায়রিয়া হলে কি ফল খাওয়া যাবে?
ডায়রিয়া চলাকালীন সব ফল খাওয়া ঠিক নয়। তবে পাকা কলা এবং আপেল (খোসা ছাড়া) ডায়রিয়া রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। কলা পটাশিয়ামের অভাব পূরণ করে এবং মল শক্ত করতে সাহায্য করে। তবে আঙুর, আনারস বা অতিরিক্ত টক জাতীয় ফল এই সময়ে এড়িয়ে চলা ভালো।
ডায়রিয়ার ঔষধ ও দামের তালিকা (২০২৬)
ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু ডায়রিয়ার ঔষধ ও দামের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
| জনপ্রিয় ব্র্যান্ড (BD) | প্রধান কাজ | আনুমানিক মূল্য (প্রতি পিস) |
| ORS (Orsaline-N, SMC) | শরীর থেকে বের হওয়া পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করে | ৬.০০ – ৭.০০ টাকা (প্যাকেট) |
| Baby Zinc (Tablet/Syrup) | বাচ্চাদের ডায়রিয়ার মেয়াদ কমায় ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় | ৫.০০ – ৮.০০ টাকা |
| Tracecad, Ecoflor (Racecadotril) | অন্ত্রের অতিরিক্ত পানি নিঃসরণ কমিয়ে পায়খানা নিয়ন্ত্রণ করে | ১৫.০০ – ২০.০০ টাকা |
| Enterogermina (Probiotic) | পেটের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজম স্বাভাবিক করে | ৬০.০০ – ৭০.০০ টাকা (অ্যাম্পুল) |
বিশেষ দ্রষ্টব্য: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ঔষধ সেবন করবেন না।
ডায়রিয়া সম্পর্কে সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
১. ডায়রিয়া হলে কি স্যালাইন খাওয়া বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, শরীর থেকে পানি ও লবণের শূন্যতা পূরণ করতে ওরস্যালাইন খাওয়া সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ।
২. মহাখালী ডায়রিয়া হাসপাতাল কি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে?
হ্যাঁ, মহাখালী ডায়রিয়া হাসপাতাল (icddr,b) বছরের প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা ডায়রিয়া রোগীদের জরুরি সেবা দিয়ে থাকে।
৩. ডায়রিয়া হলে কি দুধ জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে?
সাধারণত ডায়রিয়া চলাকালীন গরুর দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ এটি অনেক সময় পেট খারাপ বাড়িয়ে দেয়। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে বুকের দুধ বন্ধ করা যাবে না।
৪. ডায়রিয়া হলে কি ফল খাওয়া যাবে?
পাকা কলা এবং আপেল খাওয়া যাবে। এগুলো মল জমাট বাঁধতে এবং শরীরের শক্তি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
৫. কতদিন ডায়রিয়া থাকলে ডাক্তার দেখানো উচিত?
যদি ২ দিনের মধ্যে অবস্থার উন্নতি না হয়, অনবরত বমি হয় বা তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দেয়, তবে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নিন।


