মুখের ক্যানসারের একটি অন্যতম ধরন হলো মাড়ির ক্যানসার (Gum Cancer)। অনেক সময় আমরা মাড়ির সাধারণ ঘা বা ফোলাকে অবহেলা করি, যা পরবর্তীতে গুরুতর রূপ নিতে পারে। মাড়ির ক্যানসার শুরুতে শনাক্ত করা গেলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়া সম্ভব। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সচেতনতার অভাবে অনেকেই শেষ পর্যায়ে এসে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
আজকের নিবন্ধে আমরা আলোচনা করবো দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের লক্ষণ এবং এর থেকে বাঁচার উপায় সম্পর্কে।
দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ
মাড়ির ক্যানসার সাধারণত মাড়ির উপরিভাগের কোষগুলোতে শুরু হয়। নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:
১. দীর্ঘস্থায়ী ঘা (Non-healing Sores)
মাড়িতে কোনো ঘা বা ক্ষত হলে যা ২-৩ সপ্তাহের মধ্যেও ভালো হচ্ছে না, তবে সেটি ক্যানসারের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে। এটি অনেক সময় সাধারণ ‘মাউথ আলসার’ ভেবে ভুল করা হয়।
২. মাড়িতে সাদা বা লাল দাগ (White or Red Patches)
মাড়ির ত্বকে যদি অস্বাভাবিক উজ্জ্বল লাল কিংবা সাদা রঙের প্রলেপ বা দাগ দেখা যায় (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় Leukoplakia বা Erythroplakia বলা হয়), তবে তা ঝুঁকির কারণ হতে পারে।
৩. মাড়ি ফুলে যাওয়া বা পিণ্ড (Lumps or Swelling)
মাড়ির কোনো অংশ যদি অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে এবং সেখানে কোনো ব্যথা থাকুক বা না থাকুক, এটি ক্যানসারের লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় এই ফুলা অংশটি শক্ত বা দানাদার হতে পারে।
৪. দাঁত নড়বড়ে হয়ে যাওয়া (Loose Teeth)
মাড়ির হাড় বা টিস্যু ক্যানসার আক্রান্ত হলে দাঁতের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে কোনো আঘাত ছাড়াই হঠাৎ করে দাঁত নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে।
৫. রক্তপাত ও ব্যথা
মাড়ি থেকে ঘন ঘন রক্ত পড়া বা মাড়িতে অনবরত ব্যথা হওয়া (যা কানেও ছড়িয়ে পড়তে পারে) ক্যানসারের উপসর্গ হতে পারে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় ক্যানসারে অনেক সময় ব্যথা থাকে না।
৬. মুখ খুলতে বা খাবার গিলতে সমস্যা
যদি আপনার মুখ হাঁ করতে সমস্যা হয়, চিবানোর সময় ব্যথা লাগে কিংবা খাবার গিলতে কষ্ট হয়, তবে এটি ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ হতে পারে।
কেন মাড়িতে ক্যানসার হয়? (ঝুঁকির কারণসমূহ)
মাড়ির ক্যানসারের জন্য কিছু অভ্যাস সরাসরি দায়ী:
-
তামাক ও জর্দা: ধূমপান, পান-জর্দা, গুল বা খৈনি ব্যবহার মাড়ির ক্যানসারের প্রধান কারণ।
-
অ্যালকোহল: নিয়মিত মদ্যপান মুখের ক্যানসারের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
-
HPV ভাইরাস: হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণের ফলেও এই রোগ হতে পারে।
-
দাঁতের অপরিচ্ছন্নতা: দীর্ঘদিন দাঁত ও মাড়ির যত্ন না নিলে বা ধারালো দাঁত থেকে প্রতিনিয়ত ঘর্ষণ হলে ক্যানসার হতে পারে।
রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা
যদি আপনার মনে হয় যে আপনি দাঁতের মাড়িতে ক্যান্সারের লক্ষণ অনুভব করছেন, তবে ডাক্তার নিচের পরীক্ষাগুলো করতে পারেন:
-
বায়োপসি (Biopsy): আক্রান্ত স্থান থেকে ছোট টিস্যু নিয়ে ক্যানসার পরীক্ষা করা।
-
এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান (CT Scan): ক্যানসার কতটুকু ছড়িয়েছে তা দেখা।
প্রতিকার ও সচেতনতা
ক্যানসার প্রতিরোধে জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনা জরুরি:
-
তামাকজাত দ্রব্য (সিগারেট, জর্দা, গুল) পুরোপুরি বর্জন করুন।
-
অ্যালকোহল পরিহার করুন।
-
প্রতিদিন অন্তত দুই বার ব্রাশ এবং একবার ফ্লসিং করুন।
-
প্রতি ৬ মাস অন্তর একজন ডেন্টিস্টকে মুখ ও মাড়ি পরীক্ষা করান।
-
প্রচুর পরিমাণে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন।
উপসংহার
মাড়ির ক্যানসার মানেই মৃত্যু নয়, যদি তা প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে। উপরের কোনো লক্ষণের সাথে আপনার মিল থাকলে ভয় না পেয়ে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, ক্যান্সার চিকিৎসায় ‘আর্লি ডিটেকশন’ বা দ্রুত শনাক্তকরণই হলো জীবন বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার।


